ধ্বনির পরিবর্তন (Phonological Change)
ভূমিকা
ভাষা স্থির নয়—ভাষা সদা পরিবর্তনশীল। উচ্চারণের সহজতা, দ্রুত কথন, আঞ্চলিক প্রভাব, সামাজিক রুচি, সময়ের পরিবর্তন—এই সব কারণেই শব্দের ধ্বনি রূপান্তরিত হয়।
ধ্বনির পরিবর্তন বলতে বোঝায়—কোনো শব্দে স্বরধ্বনি বা ব্যঞ্জনধ্বনির যোগ, লোপ, রূপান্তর বা স্থানবদল।
বাংলা ভাষায় ধ্বনির পরিবর্তন সাধারণত ১৬ প্রকারে আলোচনা করা হয়।
১. স্বরাগম (Vowel Addition)
শব্দে নতুন স্বরধ্বনি যোগ হলে তাকে স্বরাগম বলে। এটি তিন প্রকার—
(ক) আদি স্বরাগম / Prosthesis
সংজ্ঞা:
উচ্চারণের সুবিধার জন্য শব্দের আদিতে স্বরধ্বনি যুক্ত হলে তাকে আদি স্বরাগম বলে।
কারণ:
বাংলা ভাষায় যুক্ত ব্যঞ্জন বা বিদেশি শব্দের আদিতে স্বরধ্বনি যোগ করে উচ্চারণ সহজ করা হয়।
উদাহরণ:
-
স্কুল → ইস্কুল
-
স্টেশন → ইস্টিশন
-
স্পষ্ট → ইস্পষ্ট
-
স্টিল → ইস্টিল
-
স্কার্ট → ইস্কার্ট
👉 লক্ষ্যণীয়: এখানে ‘ই’ স্বরধ্বনি যুক্ত হয়ে উচ্চারণ সহজ হয়েছে।
(খ) মধ্য স্বরাগম / বিপ্রকর্ষ / স্বরভক্তি (Anaptyxis)
সংজ্ঞা:
যুক্ত ব্যঞ্জনের মাঝখানে উচ্চারণের সুবিধার জন্য স্বরধ্বনি এলে তাকে মধ্য স্বরাগম বলে।
(১) ‘অ’ স্বরের উদাহরণ
-
রত্ন → রতন
-
ধর্ম → ধরম
-
স্বপ্ন → স্বপন
-
হর্ষ → হরষ
(২) ‘ই’ স্বরের উদাহরণ
-
প্রীতি → পিরীতি
-
ফিল্ম → ফিলিম
-
ক্লিপ → কিলিপ
-
ব্রিজ → বিরিজ
👉 গ্রামবাংলার কথ্য ভাষায় এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
(গ) অন্ত্যস্বরাগম / Apotheosis
সংজ্ঞা:
শব্দের শেষে অতিরিক্ত স্বরধ্বনি যুক্ত হলে তাকে অন্ত্যস্বরাগম বলে।
উদাহরণ:
-
দিশ → দিশা
-
বেঞ্চ → বেঞ্চি
-
সত্য → সত্যি
-
বই → বইয়া
-
লোক → লোকা
👉 কথ্য বাংলায় শব্দকে দীর্ঘ ও স্পষ্ট করার প্রবণতা কাজ করে।
২. অপিনিহিতি
সংজ্ঞা:
পরের ই-কার বা উ-কারের প্রভাবে আগের স্বরধ্বনির উচ্চারণ বদলে গেলে তাকে অপিনিহিতি বলে।
উদাহরণ:
-
আজি → আইজ
-
সাধু → সাউধ
-
রাখিয়া → রাইখ্যা
-
বাক্য → বাইক্য
-
গাছি → গাইছি
👉 এটি মূলত উচ্চারণের স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষার জন্য ঘটে।
৩. অসমীকরণ
সংজ্ঞা:
একই স্বরের পুনরাবৃত্তি এড়াতে মাঝখানে নতুন স্বর যুক্ত হলে তাকে অসমীকরণ বলে।
উদাহরণ:
-
ধপ + ধপ → ধপাধপ
-
টপ + টপ → টপাটপ
-
ঝপ + ঝপ → ঝপাঝপ
-
কড় + কড় → কড়াকড়
👉 ছন্দ ও ধ্বনিসৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত।
৪. স্বরসঙ্গতি (Vowel Harmony)
একটি স্বরের প্রভাবে অন্য স্বরের পরিবর্তন হলে স্বরসঙ্গতি হয়।
(ক) প্রগত স্বরসঙ্গতি
আদি স্বরের প্রভাবে অন্ত্য স্বরের পরিবর্তন।
উদাহরণ:
-
মূলা → মূলো
-
তুলা → তুলো
-
শিকা → শিকে
(খ) পরাগত স্বরসঙ্গতি
অন্ত্য স্বরের প্রভাবে আদ্য স্বরের পরিবর্তন।
উদাহরণ:
-
আখো → আখুয়া → এখো
(গ) মধ্যগত স্বরসঙ্গতি
আদি ও অন্ত্য স্বরের প্রভাবে মধ্য স্বরের পরিবর্তন।
উদাহরণ:
-
বিলাতি → বিলিতি
(ঘ) অন্যোন্য স্বরসঙ্গতি
আদি ও অন্ত্য স্বর উভয়েই পরিবর্তিত হয়।
উদাহরণ:
-
মোজা → মুজো
-
মুড়া → মুড়ো
-
চুলা → চুলো
৫. সম্প্রকর্ষ (Vowel Loss due to rapid speech)
দ্রুত উচ্চারণে স্বর লোপ হলে সম্প্রকর্ষ হয়।
(ক) আদি স্বরলোপ / Aphesis
-
অলাবু → লাবু → লাউ
-
উদ্ধার → উধার → ধার
(খ) মধ্য স্বরলোপ / Syncope
-
অগুরু → অগ্রু
-
সুবর্ণ → স্বর্ণ
(গ) অন্ত্য স্বরলোপ / Apocope
-
আশা → আশ
-
আজি → আজ
-
চারি → চার
-
সন্ধ্যা → সাঁঝ
৬. ধ্বনি বিপর্যয় (Metathesis)
দুটি ব্যঞ্জনের স্থানবদল ঘটলে ধ্বনি বিপর্যয় হয়।
উদাহরণ:
-
বাক্স → বাস্ক
-
রিক্সা → রিস্কা
-
ইংরেজি ask → বাংলা অ্যাস্ক
৭. সমীভবন (Assimilation)
এক ধ্বনির প্রভাবে অন্য ধ্বনি তার মতো হয়ে যায়।
(ক) প্রগত সমীভবন
-
চক্র → চক্ক
-
পদ্ম → পদ্দ
-
লগ্ন → লগ্গ
(খ) পরাগত সমীভবন
-
তৎ + জন্য → তজ্জন্য
-
উৎ + মুখ → উন্মুখ
(গ) অন্যোন্য সমীভবন
-
সত্য → সচ্চ
-
বিদ্যা → বিজ্জা
৮. দ্বিত্ব ব্যঞ্জন / ব্যঞ্জন-দ্বিত্ব
জোর বা তীব্রতা বোঝাতে ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব।
উদাহরণ:
-
পাকা → পাক্কা
-
সকাল → সক্কাল
-
কাদা → কাড্ডা
৯. ব্যঞ্জন বিকৃতি
এক ব্যঞ্জনের পরিবর্তে অন্য ব্যঞ্জন ব্যবহৃত হলে।
উদাহরণ:
-
কবাট → কপাট
-
ধোবা → ধোপা
-
ধাইমা → লাইমা
১০. ধ্বনিচ্যুতি / ব্যঞ্জনচ্যুতি
একই ধরনের দুটি ব্যঞ্জনের একটি লোপ।
উদাহরণ:
-
বউদিদি → বউদি
-
বড় দাদা → বড়দা
১১. অন্তর্হতি
শব্দের মধ্যে ব্যঞ্জন লোপ।
উদাহরণ:
-
ফাল্গুন → ফাগুন
-
ফলাহার → ফলার
-
আলাহিদা → আলাদা
১২. অভিশ্রুতি
বিপর্যস্ত স্বর পূর্ববর্তী স্বরের সঙ্গে মিলিত হলে।
উদাহরণ:
-
করিয়া → কইরিয়া → কইরা → করে
অন্যান্য কবিতা গুলির সাজেশন পেতে নীচে ক্লিক করুন -
0 Comments