৩০টি গুরুত্বপূর্ণ ১ নম্বরের প্রশ্ন ও উত্তর
কবিতা: ‘নারী’ – কাজী নজরুল ইসলাম
১. কবিতা ‘নারী’-এর রচয়িতা কে?
উত্তর: কাজী নজরুল ইসলাম।
২. কবি কোন গানের কথা বলেছেন—“সাম্যের গান”?
উত্তর: নারী-পুরুষ সমতার গান।
৩. কবির চোখে পুরুষ ও নারীর মধ্যে কীসের ভেদ নেই?
উত্তর: কোনো ভেদাভেদ নেই।
৪. বিশ্বের মহান ও কল্যাণকর সৃষ্টির অর্ধেক কার অবদান?
উত্তর: নারীর।
৫. পাপ, তাপ ও বেদনার জন্য কাকে সমানভাবে দায়ী করা হয়েছে?
উত্তর: নর ও নারী উভয়কে।
৬. কবি নারীর আদিপাপের ধারণা কীভাবে নাকচ করেছেন?
উত্তর: আদিপাপের জন্য নারীকে দায়ী করেননি।
৭. কবির মতে ‘শয়তান’ আসলে কে?
উত্তর: ক্লীব মানুষ (নর-নারী নয়)।
৮. কবিতায় নারী কীভাবে প্রকৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে?
উত্তর: রূপ, রস, গন্ধ ও সুধা দিয়ে।
৯. তাজমহলের অন্তরের প্রাণ কে?
উত্তর: মমতাজ নারী।
১০. তাজমহলের বাহিরে কার নাম আছে?
উত্তর: শাহজাহান।
১১. ‘জ্ঞানের লক্ষী’ ও ‘গানের লক্ষী’ কাকে বলা হয়েছে?
উত্তর: নারীকে।
১২. দিবসে পুরুষ কী নিয়ে আসে?
উত্তর: শক্তি ও সাহস।
১৩. নিশিতে নারী কী নিয়ে আসে?
উত্তর: শান্তি ও স্নিগ্ধতা।
১৪. কবিতায় শষ্যক্ষেত উর্বর করার কাজে নারীর ভূমিকা কী?
উত্তর: শস্য রোপণ করে সবুজ করেছে।
১৫. ধানক্ষেতের সোনালি শীষ কীসের মিলনে জন্মায়?
উত্তর: নর ও নারীর শ্রমে।
১৬. স্বর্ণ-রৌপ্য অলঙ্কার কীভাবে অলঙ্কার হয়েছে?
উত্তর: নারীর অঙ্গস্পর্শে।
১৭. কবি-প্রাণ পুরুষ কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে?
উত্তর: নারীর বিরহ ও মিলনে।
১৮. মহামানবের জন্ম কীসের মিলনে হয়?
উত্তর: নরের ক্ষুধা ও নারীর সুধায়।
১৯. বড় বড় জয়ের পেছনে কার ত্যাগ আছে?
উত্তর: মাতা, ভগ্নি ও বধূদের।
২০. ইতিহাসে কী লেখা আছে, আর কী লেখা নেই?
উত্তর: নরের যুদ্ধ লেখা আছে, নারীর ত্যাগ লেখা নেই।
২১. বিজয়ী পুরুষের তরবারী একা কি কখনো জয়ী হয়েছে?
উত্তর: না।
২২. পুরুষকে মানুষ করতে নারী কী দিয়েছে?
উত্তর: অর্ধেক হৃদয়।
২৩. লব-কুশকে কে পালন করেছিলেন?
উত্তর: সীতা।
২৪. কবির মতে কোন যুগ বাসি হয়ে গেছে?
উত্তর: যে যুগে নারী দাসী ছিল।
২৫. বর্তমান যুগকে কবি কী যুগ বলেছেন?
উত্তর: সাম্যের যুগ।
২৬. নারীর উপর অত্যাচার করলে ভবিষ্যতে কী হবে?
উত্তর: সেই অত্যাচার পুরুষের উপর ফিরে আসবে।
২৭. কবি নারীদের কোন আবরণ ছিঁড়ে ফেলতে বলেছেন?
উত্তর: ঘোমটা।
২৮. কবি নারীদের কোন প্রতীক ভাঙতে বলেছেন?
উত্তর: শিকল।
২৯. কবিতায় নারীকে কীভাবে জাগ্রত হতে বলা হয়েছে?
উত্তর: শৃঙ্খল ভেঙে প্রকাশ্যে আসতে।
৩০. কবিতার মূল বক্তব্য কী?
উত্তর: নারী-পুরুষ সমতা ও নারীমুক্তির আহ্বান।
১. ‘নারী’ কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম কীভাবে সাম্যের দর্শন প্রতিষ্ঠা করেছেন—বিশদভাবে আলোচনা করো।
উত্তর:
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে সাম্য ও মানবমুক্তির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। তাঁর ‘নারী’ কবিতাটি সাম্যের দর্শনের এক বলিষ্ঠ ও সুস্পষ্ট ঘোষণাপত্র। এই কবিতার সূচনাতেই কবি বলেন—
“সাম্যের গান গাই—
আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!”
এই ঘোষণার মধ্যেই কবিতার মূল দর্শন নিহিত। কবি নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো প্রাকৃতিক বা নৈতিক বৈষম্য স্বীকার করেন না। তাঁর মতে, মানবসভ্যতার সকল মহান ও কল্যাণকর সৃষ্টির পেছনে নারী ও পুরুষের সমান অবদান রয়েছে। তিনি বলেন—
“বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
এই বক্তব্যের মাধ্যমে কবি ঐতিহাসিক ও সামাজিক সত্যকে প্রতিষ্ঠা করেন। সমাজে পুরুষের কৃতিত্ব সর্বদা উচ্চকিত হলেও নারীর অবদানকে ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হয়েছে। নজরুল এই অবিচার ভাঙতে চেয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, শুধু সাফল্য বা মহত্ত্ব নয়—পাপ, বেদনা ও অশ্রুতেও নারী-পুরুষ সমানভাবে যুক্ত। অর্থাৎ দায়িত্ব ও মানবিকতা উভয় ক্ষেত্রেই তারা সমান।
কবি ধর্মীয় ও পৌরাণিক কুসংস্কারকেও আঘাত করেছেন। নারীকে ‘আদি-পাপের’ কারণ বলে চিহ্নিত করার প্রবণতাকে তিনি তীব্র ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর মতে, পাপ কোনো লিঙ্গের বিষয় নয়—পাপ মানুষের চরিত্রগত দুর্বলতা। এই বক্তব্য সাম্যের দর্শনকে আরও গভীর করে।
নজরুল নারীর সৃজনশীল শক্তিকে প্রকৃতির সঙ্গে তুলনা করেছেন। ফুল, ফল, সৌন্দর্য, রস, গন্ধ—সবকিছুর মধ্যেই নারীর অবদান রয়েছে। এমনকি তাজমহলের মতো স্থাপত্যেও নারীই প্রাণ, পুরুষ কেবল বাহ্যিক রূপকার। এর মাধ্যমে কবি বোঝাতে চান—সভ্যতার আত্মা নারীর মধ্যেই নিহিত।
এই কবিতায় সাম্য কেবল তাত্ত্বিক নয়, বিপ্লবী। কবি স্পষ্ট ঘোষণা করেন—যে যুগে নারী দাসী ছিল, সে যুগ বাসি। এখন সাম্যের যুগ। নারীকে বন্দি করলে ভবিষ্যতে পুরুষকেই তার ফল ভোগ করতে হবে। অর্থাৎ সাম্য কেবল নৈতিক আদর্শ নয়, যুগের ধর্ম।
এইভাবে ‘নারী’ কবিতায় নজরুল সাম্যের দর্শনকে সামাজিক, ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও মানবিক সব স্তরে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
২. কবিতায় নারীকে সভ্যতা ও সৃষ্টির মূল শক্তি হিসেবে কীভাবে চিত্রিত করা হয়েছে?
উত্তর:
‘নারী’ কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম নারীকে কেবল সমাজের একটি অংশ হিসেবে নয়, বরং সভ্যতা ও সৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কবির দৃষ্টিতে নারী ছাড়া মানবসভ্যতা কল্পনাই করা যায় না। তিনি দেখিয়েছেন—জ্ঞান, শিল্প, সংস্কৃতি, প্রেম, করুণা, এমনকি বীরত্বের উৎসও নারী।
কবি বলেন—
“এ বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল
নারী দিল তাহে রূপ-রস-সূধা-গন্ধ সুনির্মল।”
এই পংক্তিতে নারীকে প্রকৃতির সঙ্গে একাকার করে দেখা হয়েছে। নারী প্রকৃতির মতোই সৃষ্টিশীল, পুষ্টিদাত্রী ও সৌন্দর্যের আধার। প্রকৃতি যেমন প্রাণের জন্ম দেয়, তেমনি নারী মানবজীবনের সৌন্দর্য ও অনুভূতিকে পূর্ণতা দেয়।
কবি তাজমহলের উদাহরণ দিয়ে নারীর সৃষ্টিশীল শক্তিকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাজমহলের পাথর নয়, তার প্রাণ মমতাজ। অর্থাৎ পুরুষ স্থাপত্য নির্মাণ করলেও তার অন্তর্নিহিত প্রেরণা নারী।
নজরুল লক্ষ্মীর বিভিন্ন রূপের মাধ্যমে নারীর বহুমাত্রিক শক্তিকে তুলে ধরেছেন—জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য লক্ষ্মী, সৌন্দর্যের লক্ষ্মী। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে—নারী জ্ঞানচর্চা, শিল্পসৃষ্টি, কৃষি ও সৌন্দর্য—সব ক্ষেত্রেই অপরিহার্য।
শুধু সৃষ্টি নয়, কবি দেখিয়েছেন নারীর ভূমিকা মানবিকতার ক্ষেত্রেও অনন্য। পুরুষ শক্তি ও সাহস এনে দেয়, নারী আনে শান্তি, স্নেহ ও মধুরতা। এই পারস্পরিক সম্পূরক সম্পর্কের মাধ্যমেই মানবসভ্যতা এগিয়ে চলে।
এভাবে কবিতায় নারী সভ্যতার ভিত্তি, প্রাণ ও ভবিষ্যৎ—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু।
৩. ‘নারী’ কবিতায় কবির নারীবাদী চেতনার স্বরূপ আলোচনা করো।
উত্তর:
কাজী নজরুল ইসলামের নারীবাদ আধুনিক ও বিপ্লবী। ‘নারী’ কবিতায় তিনি কেবল নারী-অধিকার নয়, নারী-মর্যাদা ও মানবিক সমতার কথা বলেছেন। তাঁর নারীবাদ কোনো সংকীর্ণ লিঙ্গবাদ নয়, বরং সামগ্রিক মানবমুক্তির দর্শন।
কবি সরাসরি প্রশ্ন করেন—নারীকে নরককুণ্ড বলে হেয় করার অধিকার কার? এই প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান। তিনি বলেন—আদি পাপ নারী নয়, পাপ মানুষের দুর্বলতা।
নজরুল নারীর আত্মত্যাগকে ইতিহাসের আড়ালে পড়ে থাকা সত্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। যুদ্ধের ইতিহাসে পুরুষের রক্তপাত লেখা থাকলেও, নারীর সিঁথির সিঁদুরের বিসর্জন কেউ লেখে না। এই পংক্তির মধ্য দিয়ে কবি ইতিহাসের পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিকে ভেঙেছেন।
তিনি নারীর দাসত্বকে সরাসরি অস্বীকার করেন এবং ঘোষণা করেন—এই যুগ সাম্যের যুগ। নারী বন্দিত্ব মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। কবি নারীদের উদ্দেশে আহ্বান জানান—ঘোমটা ছিঁড়ে ফেলো, শিকল ভেঙে ফেলো।
এই আহ্বান শুধু সামাজিক নয়, মানসিক মুক্তির আহ্বান। নারীর ভীরুতা ও আত্মগোপনকে তিনি পুরুষতান্ত্রিক শোষণের ফল হিসেবে দেখেছেন।
অতএব, নজরুলের নারীবাদ সাহসী, মানবিক ও যুগান্তকারী।
৪. কবিতায় পুরুষ ও নারীর পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে?
উত্তর:
কাজী নজরুল ইসলামের ‘নারী’ কবিতায় পুরুষ ও নারীর সম্পর্ককে কবি একেবারেই নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। এই সম্পর্ক কোনো প্রতিযোগিতা, আধিপত্য বা অধীনতার সম্পর্ক নয়; বরং এটি পরিপূরকতা, সাম্য ও সহাবস্থানের সম্পর্ক। কবি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন—
“আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!”
এই পংক্তির মধ্য দিয়েই কবি সমাজে প্রচলিত লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করে দেন। পুরুষ ও নারী—উভয়েই সমানভাবে মানবসভ্যতার স্রষ্টা ও অংশীদার। কবির মতে, পৃথিবীর যা কিছু মহান, কল্যাণকর ও সুন্দর—তার অর্ধেক নারী সৃষ্টি করেছে, অর্ধেক পুরুষ। অর্থাৎ মানবসভ্যতা একক কোনো লিঙ্গের কৃতিত্ব নয়।
কবি পুরুষ ও নারীর সম্পর্ককে প্রকৃতির রূপকের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন—দিন ও রাত, রৌদ্র ও যামিনী, মরুতৃষা ও মধু। পুরুষ যেখানে শক্তি, সাহস ও সংগ্রামের প্রতীক, নারী সেখানে শান্তি, স্নেহ ও সান্ত্বনার উৎস। এই দুই শক্তি একে অপরের বিরোধী নয়; বরং একে অপরকে সম্পূর্ণ করে। কবি বলেন—
“দিবসে দিয়াছে শক্তি সাহস, নিশিথে হয়েছে বন্ধু”
এখানে সম্পর্কটি পারস্পরিক নির্ভরশীলতার। পুরুষের শক্তি নারীর স্নেহ ছাড়া অসম্পূর্ণ, আবার নারীর স্নেহ পুরুষের সংগ্রাম ছাড়া অর্থহীন নয়।
কৃষিজীবনের রূপক ব্যবহার করে কবি দেখান—পুরুষ চালায় হাল, নারী বহন করে জল। জল ও মাটি মিশে যেমন ফসল ফলায়, তেমনি পুরুষ ও নারীর সম্মিলনে মানবসভ্যতা বিকশিত হয়। অর্থাৎ একা কেউই সৃষ্টিশীল নয়। এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো সহযোগিতা।
কবিতায় কবি নারীর ভূমিকা শুধু গৃহকেন্দ্রিক করে রাখেননি। নারী জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য লক্ষ্মী—অর্থাৎ জ্ঞান, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী সমানভাবে অবদান রেখেছে। ফলে পুরুষ ও নারীর সম্পর্ক কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সীমায় আবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্র ও সভ্যতার স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত।
কবি আরও বলেন—
“পুরুষ-হৃদয়হীন, মানুষ করিতে নারী দিল তারে অর্ধেক হৃদয় ঋণ।”
এই পংক্তিতে নারীর মানবিক ভূমিকা স্পষ্ট। পুরুষের মধ্যে মানবিকতা, প্রেম, দয়া—এসব গুণ নারীর মাধ্যমেই বিকশিত হয়েছে। অর্থাৎ পুরুষের মনুষ্যত্ব গঠনে নারীর অবদান অপরিসীম।
সবশেষে বলা যায়, ‘নারী’ কবিতায় পুরুষ ও নারীর সম্পর্ককে কবি আধিপত্য নয়, সাম্যের সম্পর্ক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই সম্পর্কের ভিত্তি হলো সহযোগিতা, পরিপূরকতা ও সমান মর্যাদা—যা আধুনিক মানবতাবাদী চেতনার প্রতিফলন।
৫. ‘নারী’ কবিতায় ইতিহাস ও সমাজচেতনার ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর:
‘নারী’ কবিতাটি কেবল একটি কাব্যিক আবেগের প্রকাশ নয়; এটি ইতিহাস ও সমাজচেতনার এক তীব্র দলিল। কাজী নজরুল ইসলাম ইতিহাসকে কবিতার ভিতরে এনে দেখিয়েছেন—ইতিহাস আসলে কতটা পুরুষকেন্দ্রিক এবং নারীর অবদান কীভাবে পরিকল্পিতভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।
কবি বলেন—
“কোন রণে কত খুন দিল নর, লেখা আছে ইতিহাসে
কত নারী দিল সিঁথির সিদুর, লেখা নাই তার পাশে।”
এই পংক্তিতে কবি ইতিহাসচর্চার এক গভীর অসঙ্গতি তুলে ধরেছেন। যুদ্ধ, জয়, রক্তপাত—এসবই ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। কিন্তু সেই যুদ্ধের ফলে কত নারী স্বামী হারিয়েছে, কত মা সন্তান হারিয়েছে—তার কোনো হিসাব ইতিহাস রাখেনি। এখানে কবির সমাজচেতনা অত্যন্ত প্রখর।
ইতিহাসে পুরুষের বীরত্ব স্মরণ করা হয়েছে স্তম্ভ, মূর্তি ও উৎসবের মাধ্যমে। কিন্তু সেই বীরত্বের পেছনে নারীর ত্যাগ, প্রেরণা ও সহনশীলতার কথা লেখা নেই। কবি প্রশ্ন করেন—
“বীর স্মৃতি স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?”
এই প্রশ্ন আসলে সমাজের প্রতি এক তীব্র প্রতিবাদ।
কবিতায় রাম-সীতা, লব-কুশের প্রসঙ্গ এনে কবি দেখান—পুরুষের যশের পেছনে নারীর নিঃশব্দ ত্যাগ লুকিয়ে থাকে। রামকে মহাপুরুষ বলা হয়, কিন্তু সীতার ত্যাগকে ইতিহাস যথাযথ মর্যাদা দেয়নি। এখানেই কবির সমাজচেতনা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
নজরুল মনে করেন, যে যুগে নারী দাসী ছিল, সে যুগ বাসি। তিনি ঘোষণা করেন—এখন বেদনার যুগ নয়, সাম্যের যুগ। এই ঘোষণা কেবল সাহিত্যিক নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘোষণাও বটে। নারীকে বন্দি রাখলে সেই কারাগার একদিন পুরুষকেও গ্রাস করবে—এই সতর্কবার্তায় কবির সমাজদর্শন স্পষ্ট।
এইভাবে ‘নারী’ কবিতায় ইতিহাস ও সমাজচেতনা একত্রে কাজ করে সমাজের ভণ্ডামি, বৈষম্য ও অন্যায়কে উন্মোচন করেছে।
৬. কবিতায় নারীর আত্মত্যাগ ও অবদান কীভাবে উপেক্ষিত হয়েছে—আলোচনা করো।
উত্তর:
‘নারী’ কবিতার অন্যতম প্রধান সুর হলো—নারীর আত্মত্যাগ ও অবদানের চরম অবমূল্যায়ন। কাজী নজরুল ইসলাম অত্যন্ত শক্তিশালী ভাষায় দেখিয়েছেন, কীভাবে সমাজ ও ইতিহাস নারীর ত্যাগকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়ে তা উপেক্ষা করে এসেছে।
নারীর আত্মত্যাগ শুরু হয় পরিবার থেকে। মা হিসেবে, বোন হিসেবে, স্ত্রী হিসেবে নারী নিজের সুখ বিসর্জন দেয়। কবি বলেন—
“কত মাতা দিল হৃদয় উপড়ি, কত বোন দিল সেবা”
এই আত্মত্যাগ এতটাই স্বাভাবিকীকৃত যে সমাজ সেটিকে আর ত্যাগ বলেই গণ্য করে না। অথচ পুরুষের সামান্য অবদানও ইতিহাসে মহিমান্বিত হয়ে ওঠে।
যুদ্ধক্ষেত্রে পুরুষ রক্ত দেয়—তা ইতিহাসে লেখা হয়। কিন্তু যুদ্ধের পরে যে নারীরা সারাজীবন শোক বহন করে, তাদের ত্যাগ অদৃশ্য থেকে যায়। নারীর এই নীরব আত্মত্যাগ সমাজের চোখে মূল্যহীন।
কবিতায় নারীর অবদান শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও উপেক্ষিত। কবি বলেন—
“নারীর বিরহে, নারীর মিলনে নর পেল কবি-প্রাণ”
নারী অনুপ্রেরণা, কিন্তু কৃতিত্ব পায় পুরুষ। কবিতা, গান, শিল্প—সবখানেই নারী উৎস হলেও ইতিহাসে সে পর্দার আড়ালে।
এমনকি অলংকার পর্যন্ত নারীর স্পর্শে সুন্দর হলেও, সেই অলংকার নারীর শৃঙ্খলে পরিণত হয়। ঘোমটা, শিকল, অলংকার—সবই নারীর অবদমনকে ঢেকে রাখার উপকরণ।
নজরুল তাই নারীর প্রতি আহ্বান জানান—ঘোমটা ছিঁড়ে ফেলো, শিকল ভাঙো। কারণ নারীর আত্মত্যাগ আর নীরব থাকা উচিত নয়। আত্মত্যাগের মর্যাদা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন সমাজ তা স্বীকার করবে।
সবশেষে বলা যায়, কবিতায় নারীর আত্মত্যাগ ও অবদান উপেক্ষিত হয়েছে—এই সত্যটিকে কবি শুধু তুলে ধরেননি, বরং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন।
0 Comments