New Updates

6/recent/ticker-posts

Header Ads Widget

CLASS 12 BENGALI ‘কালবৈশাখী’ – মোহিতলাল মজুমদার FINAL SUGGESTION 2026

 


৩০টি গুরুত্বপূর্ণ ১ নম্বরের প্রশ্ন ও উত্তর

কবিতা: ‘কালবৈশাখী’ – মোহিতলাল মজুমদার

১. ‘কালবৈশাখী’ কবিতার রচয়িতা কে?
উত্তর: মোহিতলাল মজুমদার।

২. কবিতায় ‘মধ্যদিনের রক্ত নয়ন’ কী বোঝায়?
উত্তর: প্রচণ্ড সূর্যালোক।

৩. ধরণীর উপর ‘বিরাট ছায়ার ছত্র’ কী নির্দেশ করে?
উত্তর: ঘন কালো মেঘ।

৪. কোন শক্তি জলস্থলের নিশ্বাস হরণ করে?
উত্তর: কালবৈশাখী ঝড়।

৫. ‘গগন ভরিল কে’—এখানে কে বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: কালবৈশাখী ঝড়।

৬. কবিতায় বনস্পতিদের নিস্পন্দ হওয়ার কারণ কী?
উত্তর: ঝড়ের পূর্বাভাস।

৭. ‘বারুদের ঘ্রাণ’ কোন অনুভূতির প্রতীক?
উত্তর: আসন্ন ভয়ংকর ঝড়ের।

৮. দূর গগনের বজ্রঘোষণ কীসের ইঙ্গিত দেয়?
উত্তর: প্রবল কালবৈশাখীর আগমন।

৯. ধূম্র মেঘের ঘটা কিসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে?
উত্তর: ভীমকুণ্ডল জটার সঙ্গে।

১০. ‘মিহির’ শব্দটি কী বোঝায়?
উত্তর: সূর্য।

১১. কালবৈশাখী সূর্যকে কী করতে উদ্যত?
উত্তর: গ্রাস করতে।

১২. ‘ঘোর নির্ঘোষ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: প্রচণ্ড ঝড়ের শব্দ।

১৩. ঝড়ের গর্জনকে কীসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে?
উত্তর: রণদুন্দুভির সঙ্গে।

১৪. ‘সন্ধ্যার বেণিবন্ধন খুলছে’—এর অর্থ কী?
উত্তর: অন্ধকার নেমে আসছে।

১৫. দিগ্‌বারণেরা কিসে বিদীর্ণ হচ্ছে?
উত্তর: আকাশের দন্তে।

১৬. কবিতায় দুই মহাবলের যুদ্ধ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: প্রকৃতির শক্তির সংঘর্ষ।

১৭. অনাবৃষ্টির অসুরকে কে নিশ্চিহ্ন করেছে?
উত্তর: কালবৈশাখী ঝড়।

১৮. কালো যবনিকা ছিন্ন হওয়ার অর্থ কী?
উত্তর: অন্ধকার দূর হওয়া।

১৯. রণবাহিনী বিজয়শঙ্খ বাজিয়ে কোথায় ফিরে যায়?
উত্তর: আকাশে।

২০. ঝড়ের পর আকাশ কেমন হয়?
উত্তর: নীল ও নির্মল।

২১. ঝড়ের পরে নদীর অবস্থা কী হয়?
উত্তর: উথলে ওঠে।

২২. কালবৈশাখী কোন মাসের শেষে আসে?
উত্তর: চৈত্র মাসে।

২৩. কালবৈশাখীকে নববর্ষের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে কেন?
উত্তর: পুরাতন জরা দূর করে নতুনের আগমনের জন্য।

২৪. কবি কালবৈশাখীকে ভয়ংকর হলেও কেমন বলে দেখেছেন?
উত্তর: উল্লাসকর।

২৫. চৈত্রের চিতা-ভস্ম উড়িয়ে দেওয়ার অর্থ কী?
উত্তর: পৃথিবীর জ্বালা নিবারণ।

২৬. কালবৈশাখী মৃত্তিকায় কী সঞ্চার করে?
উত্তর: রস ও উর্বরতা।

২৭. ‘পিনাকের টংকার’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: বজ্রধ্বনি।

২৮. কালবৈশাখীকে কবি কেন শুভ কীর্তি বলেছেন?
উত্তর: সে নবজীবনের বার্তা আনে।

২৯. ‘কাল-পুরুষের পরামর্শ’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ধ্বংসের মধ্যেও সৃষ্টির পরিকল্পনা।

৩০. কবিতার মূল ভাব কী?
উত্তর: ধ্বংসের মধ্য দিয়ে নবজীবন ও আশার আবির্ভাব।

১. ‘কালবৈশাখী’ কবিতায় প্রকৃতির ভয়ংকর রূপ কীভাবে চিত্রিত হয়েছে—বিশদ আলোচনা করো।

উত্তর:
মোহিতলাল মজুমদারের ‘কালবৈশাখী’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে প্রকৃতির ভয়ংকর ও মহিমান্বিত রূপের এক অনন্য কাব্যিক রূপায়ণ। কবিতার সূচনাতেই কবি মধ্যদিনের উজ্জ্বল আলো হঠাৎ অন্ধকারে ঢেকে যাওয়ার চিত্র এঁকেছেন—“মধ্যদিনের রক্ত নয়ন অন্ধ করিল কে!”। এখানে সূর্যের তেজস্বী রক্তিম দৃষ্টিকে গ্রাস করেছে অজানা এক অন্ধকার শক্তি। এই প্রশ্নবোধক ভঙ্গি প্রকৃতির রহস্যময়তা ও অপ্রতিরোধ্য শক্তিকে নির্দেশ করে।

কবি কালবৈশাখীকে কেবল একটি ঝড় হিসেবে নয়, এক বিশাল মহাজাগতিক ঘটনারূপে উপস্থাপন করেছেন। আকাশে ধূসর মেঘের ঘটা কবির কাছে যেন কোনো দৈত্যাকার মস্তকের জটাজাল। মেঘের এই গর্জন, বিদ্যুতের ঝলকানি, বজ্রের নাসা-গর্জন—সব মিলিয়ে এক ভয়াল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। প্রকৃতি এখানে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এক স্বাধীন শক্তি।

ঝড়ের আগমনের পূর্বলক্ষণ হিসেবে কবি দেখান বনস্পতির নিস্তব্ধতা, বাতাসে বারুদের গন্ধ, দূর আকাশের বজ্রনিনাদ। এই সব চিত্রের মাধ্যমে প্রকৃতির অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা প্রকাশ পায়। যেন প্রকৃতি নিজেই আসন্ন বিস্ফোরণের জন্য প্রস্তুত।

কালবৈশাখীর সময় প্রকৃতির রুদ্ররূপ আরও প্রকট হয়—দিক থেকে দিকান্তে ঝলসে ওঠে বিদ্যুৎ, আকাশে রণদুন্দুভির মতো বজ্রনিনাদ শোনা যায়। কবি এই দৃশ্যকে দেব-দানবের যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। প্রকৃতির শক্তিগুলি যেন একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত।

কিন্তু এই ভয়ংকর রূপ চিরস্থায়ী নয়। ঝড় শেষে আকাশ পরিষ্কার হয়, বাতাসে আসে প্রশান্তি, নদী কুলুকুলু ভাষায় বয়ে চলে, গাছপালা নিশ্চিন্তে নিশ্বাস নেয়। অর্থাৎ প্রকৃতির ভয়ংকরতা শেষ পর্যন্ত কল্যাণের পথেই নিয়ে যায়। এই দ্বৈত রূপ—ধ্বংস ও সৃষ্টির—মধ্য দিয়েই কবি প্রকৃতির পূর্ণতা প্রকাশ করেছেন।

এইভাবে ‘কালবৈশাখী’ কবিতায় প্রকৃতি একদিকে রুদ্র, অন্যদিকে কল্যাণময়—ভয়ংকর হলেও জীবনের নবজাগরণের বাহক।

২. কবিতায় কালবৈশাখী ঝড়কে দেবতুল্য শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের তাৎপর্য আলোচনা করো।

উত্তর:
‘কালবৈশাখী’ কবিতায় মোহিতলাল মজুমদার ঝড়কে কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখেননি; তিনি তাকে দেবতুল্য, প্রায় পৌরাণিক শক্তি হিসেবে কল্পনা করেছেন। কবিতার বহু স্থানে ঝড়ের রূপকল্প দেব-দানবের যুদ্ধ, কালপুরুষের আবির্ভাব, শিবের তাণ্ডবের স্মৃতি জাগায়।

আকাশে ধূসর মেঘের ঘটা কবির চোখে যেন “ভীমকুন্ডল জটা”—শিবের জটার সঙ্গে তুলনীয়। বজ্রের গর্জনকে তিনি রণদুন্দুভির সঙ্গে তুলনা করেছেন। বিদ্যুতের ঝলকানি যেন অসির ফলক। এই রূপকগুলি ঝড়কে এক অতিমানবিক শক্তিতে উত্তীর্ণ করে।

এই দেবতুল্য উপস্থাপনার মাধ্যমে কবি বোঝাতে চান—প্রকৃতি মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। মানুষ সভ্যতা গড়ে অহংকারী হলেও প্রকৃতির সামনে সে ক্ষুদ্র। কালবৈশাখী সেই অহংকার ভেঙে দেয়। কিন্তু এই দেবতুল্য শক্তি কেবল ধ্বংস করে না—সে শুদ্ধ করে, নতুনের পথ তৈরি করে।

ঝড় শেষে প্রকৃতির শুদ্ধতা ও প্রশান্তি কবিতায় বিশেষভাবে উল্লিখিত। আকাশ ধৌত হয়, মাটি নবজীবন পায়, তৃণাঙ্কুরে রস সঞ্চার হয়। অর্থাৎ দেবতুল্য ঝড় ধ্বংসের মাধ্যমে নবসৃষ্টির পথ প্রশস্ত করে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ—যেখানে ধ্বংস ও সৃষ্টি একই চক্রের অংশ। শিব যেমন ধ্বংসের দেবতা হয়েও সৃষ্টির সহায়ক, তেমনি কালবৈশাখীও ভয়ংকর হয়েও কল্যাণকর।

৩. ‘কালবৈশাখী’ কবিতায় ধ্বংস ও সৃষ্টির দ্বন্দ্ব কীভাবে প্রকাশিত হয়েছে?

উত্তর:
মোহিতলাল মজুমদারের ‘কালবৈশাখী’ কবিতাটি বাংলা প্রকৃতি-কাব্যের এক অনন্য নিদর্শন, যেখানে কবি কালবৈশাখী ঝড়কে কেবল একটি ভয়ংকর প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং ধ্বংস ও সৃষ্টির চিরন্তন দ্বন্দ্বের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কবিতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই দ্বৈত সত্তা—একদিকে উন্মত্ত ধ্বংস, অন্যদিকে নবসৃষ্টির আশ্বাস—অত্যন্ত নাটকীয় ও গভীর শিল্পিত রূপে প্রকাশ পেয়েছে।

কবিতার সূচনাতেই কবি ধ্বংসের রূপটিকে সামনে আনেন। মধ্যদিনের তীব্র আলো হঠাৎ অন্ধকারে ঢেকে যায়, প্রকৃতি যেন অচেতন হয়ে পড়ে। কবির প্রশ্ন—
“মধ্যদিনের রক্ত নয়ন অন্ধ করিল কে!”
এই পংক্তিতে ধ্বংসের আকস্মিকতা ও ভয়াবহতা প্রকাশ পায়। সূর্যালোকের বিলুপ্তি শুধু আলো হারানো নয়, এটি জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে যাওয়ার প্রতীক। গগনে বিরাট ছায়ার ছত্র নেমে আসা, বনস্পতির নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়ানো—সবই ধ্বংসের পূর্বলক্ষণ।

ঝড়ের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি যেন এক মহাযুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। বজ্রগর্জন, রণদুন্দুভির শব্দ, দিগ্বিদিক বিদীর্ণ হওয়া—এসব চিত্রে ধ্বংস এক ভয়াল রূপ ধারণ করে। কবি ঝড়কে তুলনা করেছেন দুই মহাবলের সংঘর্ষের সঙ্গে—
“যুঝিতেছে কোন্ দুই মহাবল দ্যুলোকের দূর পন্থা!”
এখানে ধ্বংস যেন কেবল প্রকৃতির নয়, এক মহাজাগতিক শক্তির সংঘর্ষ।

কিন্তু এই ধ্বংসই কবিতার শেষ কথা নয়। কবি অত্যন্ত সচেতনভাবে দেখিয়েছেন—এই উন্মত্ত ধ্বংসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সৃষ্টির বীজ। ঝড়ের তাণ্ডব শেষে আকাশ নির্মল হয়, ধরণী ধৌত হয়, নদী কুলুকুলু ধ্বনিতে প্রবাহিত হয়। প্রকৃতি যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। কবি বলেন—
“আকাশের নীল নির্মল হল — ধৌত ধরার পঙ্ক।”
এই পংক্তিতে ধ্বংসের পর সৃষ্টির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। ঝড় ধ্বংস করে ঠিকই, কিন্তু সেই ধ্বংসই মাটিকে উর্বর করে, জীবনের নবচক্র শুরু করে।

কালবৈশাখী চৈত্রের দহনজ্বালা প্রশমিত করে। খরার ক্লান্ত পৃথিবী ঝড়ের জলে স্নাত হয়। তৃণ-অঙ্কুরে নতুন রস সঞ্চারিত হয়, মৃত্তিকার বুকে মধু ভরে ওঠে। অর্থাৎ ঝড় ধ্বংসের মাধ্যমে পুরনো জীর্ণতাকে সরিয়ে দিয়ে নবজীবনের পথ প্রস্তুত করে।

এই দ্বন্দ্বের দার্শনিক দিকটি কবিতার শেষাংশে আরও গভীর হয়। কবি বলেন—
“ওরি মাঝে আছে কাল-পুরুষের সুগভীর পরামর্শ।”
এখানে ‘কাল-পুরুষ’ সময়ের প্রতীক। সময় কখনো নির্মম, কখনো কল্যাণকর। ধ্বংস তার হাতিয়ার, সৃষ্টি তার লক্ষ্য। কালবৈশাখী সেই সময়ের দূত—যে ধ্বংসের মাধ্যমে নববিধানের আশ্বাস দেয়।

অতএব, ‘কালবৈশাখী’ কবিতায় ধ্বংস ও সৃষ্টি পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। ধ্বংস ছাড়া সৃষ্টি অসম্ভব—এই চিরন্তন সত্যই কবি প্রকৃতির ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।

৪. কবিতায় ব্যবহৃত প্রশ্নবোধক ভঙ্গির তাৎপর্য আলোচনা করো।

উত্তর:
‘কালবৈশাখী’ কবিতায় প্রশ্নবোধক ভঙ্গি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অলংকারিক ও ভাবগত উপাদান। কবিতার শুরুতেই একের পর এক প্রশ্নের মাধ্যমে কবি পাঠককে বিস্ময়, উদ্বেগ ও কৌতূহলের আবহে প্রবেশ করান। এই প্রশ্নগুলি শুধু তথ্য জানার জন্য নয়; এগুলি প্রকৃতির রহস্য, শক্তি ও মানবচেতনার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরার মাধ্যম।

কবিতার প্রথম স্তবকেই কবি প্রশ্ন করেন—
“মধ্যদিনের রক্ত নয়ন অন্ধ করিল কে!”
এই প্রশ্নের উত্তর কবি দেন না। কারণ এর উত্তর মানববুদ্ধির নাগালের বাইরে। এখানে প্রশ্নের মাধ্যমে কবি প্রকৃতির অজেয় শক্তির সামনে মানুষের অসহায়তা প্রকাশ করেছেন। একইভাবে—
“ধরণীর ’পরে বিরাট ছায়ার ছত্র ধরিল কে!”
এই প্রশ্ন প্রকৃতির রহস্যময় ক্ষমতার দিকে ইঙ্গিত করে।

প্রশ্নবোধক ভঙ্গি কবিতার নাটকীয়তা বাড়িয়েছে। ঝড় আসার মুহূর্তে প্রকৃতির অস্বাভাবিকতা প্রশ্নের মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় পাঠকও যেন সেই বিস্ময়ে শামিল হয়। প্রশ্নগুলি কবিতাকে একঘেয়ে বর্ণনা থেকে মুক্ত করে গতিশীল করে তুলেছে।

এই প্রশ্নগুলি কখনো প্রকৃতিকে দেবত্বের রূপ দেয়। যেমন—মেঘের ঘটা যেন কোনো বিশাল মুণ্ডের জটা, বজ্র যেন দেবতার অস্ত্র। প্রশ্নের মাধ্যমে কবি প্রকৃতিকে পৌরাণিক ও অতিলৌকিক রূপে কল্পনা করেছেন। এতে কবিতায় এক মহাকাব্যিক আবহ তৈরি হয়েছে।

আবার কিছু প্রশ্ন মানবসমাজের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। বনস্পতির নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়ানো দেখে কবি প্রশ্ন করেন—এ কি মৃত্যুভয়, না আসন্ন বিপদের আভাস? প্রশ্নের মধ্য দিয়ে কবি প্রকৃতির সঙ্গে জীবজগতের সংবেদনশীল সম্পর্ক তুলে ধরেছেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই প্রশ্নগুলির মাধ্যমে কবি পাঠককে ভাবতে বাধ্য করেন। কবিতা পাঠ নিছক দৃশ্যগ্রহণে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা এক দার্শনিক অনুসন্ধানে পরিণত হয়। প্রশ্নগুলি উত্তরহীন থেকেও অর্থবহ।

সুতরাং ‘কালবৈশাখী’ কবিতায় প্রশ্নবোধক ভঙ্গি কেবল ভাষার অলংকার নয়; এটি কবিতার ভাবগভীরতা, রহস্যময়তা ও দার্শনিক বিস্তার বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে।

৫. ‘কালবৈশাখী’ কবিতায় শব্দচিত্র ও ধ্বনিবৈচিত্র্যের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।

উত্তর:
‘কালবৈশাখী’ কবিতার অন্যতম প্রধান শিল্পগুণ হলো এর শক্তিশালী শব্দচিত্র ও অসাধারণ ধ্বনিবৈচিত্র্য। মোহিতলাল মজুমদার শব্দের মাধ্যমে এমন এক জীবন্ত দৃশ্য নির্মাণ করেছেন, যেখানে পাঠক শুধু পড়ে নয়—দেখে, শোনে ও অনুভব করে ঝড়ের তাণ্ডব।

প্রথমেই শব্দচিত্রের কথা বলা যায়। কবি রঙ, আলো ও গতি—এই তিনটি উপাদানের সাহায্যে ঝড়ের দৃশ্য এঁকেছেন। ‘ধূম্র মেঘের ঘটা’, ‘কালো যবনিকা’, ‘বঙ্কিম-নীল অসি’—এই শব্দগুলি চোখের সামনে অন্ধকার, ভয়ংকর আকাশের ছবি এঁকে দেয়। আলো-অন্ধকারের দ্বন্দ্ব শব্দচিত্রের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ধ্বনিবৈচিত্র্য কবিতাটিকে আরও প্রাণবন্ত করেছে। বজ্রগর্জনের শব্দ বোঝাতে কবি ব্যবহার করেছেন—‘ঘোর নির্ঘোষ’, ‘গুরু-গুরু রব’, ‘নাসা-গর্জন’, ‘রণদুন্দুভি’। এই অনুকারধ্বনি পাঠকের কানে সরাসরি ঝড়ের আওয়াজ পৌঁছে দেয়। শব্দগুলি শুধু অর্থ বহন করে না, শব্দের ধ্বনিতেই ঝড়ের তাণ্ডব প্রকাশ পায়।

‘ঝনঝনি’, ‘কুলুকুলু’—এই ধ্বনিগুলি ঝড়ের পরে শান্তির আগমনের ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ ধ্বনি পরিবর্তনের মাধ্যমে কবি ধ্বংস থেকে সৃষ্টির যাত্রাপথ দেখিয়েছেন। প্রথমে কর্কশ, ভয়ংকর ধ্বনি—পরে কোমল, স্নিগ্ধ ধ্বনি।

শব্দচিত্রের সাহায্যে কবি ঝড়কে মানবিক ও পৌরাণিক রূপ দিয়েছেন। মেঘের জটা, পিনাকের টংকার, বিজয়শঙ্খ—এই সব শব্দচিত্র কালবৈশাখীকে দেবতুল্য করে তোলে। ঝড় যেন শুধু প্রাকৃতিক নয়, এক ঐশ্বরিক শক্তির প্রকাশ।

সবশেষে বলা যায়, শব্দচিত্র ও ধ্বনিবৈচিত্র্য ছাড়া ‘কালবৈশাখী’ কবিতার আবেগ, গতি ও গভীরতা অসম্পূর্ণ থাকত। এই দুই উপাদান কবিতাটিকে এক অনন্য শ্রুতিমধুর ও চিত্রময় শিল্পকর্মে পরিণত করেছে।

Post a Comment

0 Comments