২০টি গুরুত্বপূর্ণ ১ নম্বরের প্রশ্ন ও উত্তর
কবিতা: ‘যুদ্ধ কেন?’ – দিনেশ দাস
১. ‘যুদ্ধ কেন?’ কবিতার রচয়িতা কে?
উত্তর: দিনেশ দাস।
২. কবিতায় পৃথিবীকে কেমন বলা হয়েছে?
উত্তর: পৃথিবী অনেক বড়।
৩. পৃথিবী বড় হওয়া সত্ত্বেও কী ঘটে?
উত্তর: মানুষ যুদ্ধ করে।
৪. যুদ্ধের ফলে কী ওড়ে বলে কবি বলেছেন?
উত্তর: মৃত্যুর হাওয়া।
৫. আজ আকাশ জুড়ে কী ছড়িয়ে আছে?
উত্তর: মহাসমরের মহামারি।
৬. যুদ্ধে জয় বা পরাজয়কে কবি কেমন বলেছেন?
উত্তর: চরমতম নয়।
৭. কবির মূল প্রশ্ন কী?
উত্তর: কেন হবে বারবার বর্বর এই অভিনয়?
৮. পৃথিবী বারবার চিড় খায় কিসের কারণে?
উত্তর: আহাম্মকের ক্রুর আকাঙ্ক্ষায়।
৯. পৃথিবী কিসের চাকায় চিড় খায়?
উত্তর: ট্যাংকের চাকায়।
১০. পৃথিবীকে কবি কোন যন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন?
উত্তর: ফাটা রেকর্ডের সঙ্গে।
১১. কবির গানের পিন কোথায় বেঁধে গেছে?
উত্তর: হঠাৎ ফাটলে।
১২. ফাটা রেকর্ডের মতো পৃথিবী কী করে?
উত্তর: বারে বারে একঘেয়ে কথা বলে।
১৩. কবি কী ভেঙে চুরে পিষে ফেলতে নিষেধ করেছেন?
উত্তর: জলাভূমি, মাঠ ও জঙ্গল।
১৪. কবি কোথায় বসতি স্থাপনের কথা বলেছেন?
উত্তর: মেরুতে।
১৫. কবি কোথায় বীজ বোনার কথা বলেছেন?
উত্তর: কিরঘিজ স্টেপিসে।
১৬. কবি যুদ্ধের পরিবর্তে কী ব্যবহারের কথা বলেছেন?
উত্তর: বিজ্ঞান ও আলো।
১৭. কবিতায় যুদ্ধকে কী বলা হয়েছে?
উত্তর: বর্বর অভিনয়।
১৮. কবির মতে পৃথিবী দখলের জন্য কী প্রয়োজন নেই?
উত্তর: যুদ্ধ।
১৯. কবিতায় ট্যাংক কিসের প্রতীক?
উত্তর: ধ্বংস ও যুদ্ধের।
২০. কবিতার মূল বক্তব্য কী?
উত্তর: যুদ্ধ নয়, শান্তিপূর্ণ উন্নয়নই মানবতার পথ।
১. ‘যুদ্ধ কেন?’ কবিতায় কবি যুদ্ধের অযৌক্তিকতা ও মানবিক সংকটকে কীভাবে তুলে ধরেছেন—বিশদ আলোচনা করো।
উত্তর:
দিনেশ দাসের কবিতা ‘যুদ্ধ কেন?’ আধুনিক বাংলা কবিতায় এক তীব্র মানবিক প্রতিবাদ। এই কবিতার মূল সুর হলো—যুদ্ধের অযৌক্তিকতা, বর্বরতা এবং মানবসভ্যতার গভীর সংকট। কবি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক তত্ত্ব উপস্থাপন করেন না; বরং প্রশ্নের মাধ্যমে মানবসমাজের বিবেককে নাড়া দেন। কবিতার শুরুতেই তিনি বলেন—“পৃথিবী অনেক বড়ো—এখনে ক-কেটি লোক”, অর্থাৎ পৃথিবীতে মানুষের থাকার জন্য জায়গার কোনো অভাব নেই। তবুও মানুষ যুদ্ধ করে, কারণ “আরো চাই”—এই লোভ, আগ্রাসন ও ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষাই যুদ্ধের মূল কারণ।
কবি যুদ্ধকে বলেছেন “মহাসমরের মহামারি”—এই উপমার মাধ্যমে তিনি যুদ্ধকে একটি সংক্রামক রোগের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা গোটা মানবজাতিকে গ্রাস করে। মহামারির মতো যুদ্ধও নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে, সভ্যতা ধ্বংস করে এবং ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তোলে। এখানে যুদ্ধ জেতা বা হারার প্রশ্নকে কবি গুরুত্ব দেননি। তাঁর কাছে আসল প্রশ্ন—“কেন হবে বারবার বর্বর এই অভিনয়?” এই প্রশ্নের মধ্যেই কবিতার দার্শনিক গভীরতা নিহিত।
কবি দেখিয়েছেন, যুদ্ধ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতার ফল। “আহাম্মকের ক্রুর আকাঙ্ক্ষায়” পৃথিবী বারবার “ট্যাংকের চাকায় চিড় খায়”—এই চিত্রকল্পে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের নিষ্ঠুর রূপ ফুটে ওঠে। ট্যাংকের চাকা কেবল মাটি নয়, মানবিক মূল্যবোধকেও পিষে দেয়। যুদ্ধ এখানে একঘেয়ে, পুনরাবৃত্তিমূলক এক বর্বর নাটক—“ফাটা রেকর্ডের মতো পৃথিবীটা ঘুরে চলে”—যেখানে একই ধ্বংস, একই মৃত্যু বারবার ফিরে আসে।
কবির মতে, যুদ্ধ মানুষের কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতার চরম অপচয়। পৃথিবী এত বড়ো যে মানুষ চাইলে জলাভূমি, মাঠ, জঙ্গল গড়ে তুলতে পারে; মেরু অঞ্চলে বসতি স্থাপন করতে পারে; কিরঘিজ স্টেপিসে বীজ বুনতে পারে। অর্থাৎ মানুষের সামনে সৃজনের অসীম সম্ভাবনা আছে। অথচ সেই শক্তি ধ্বংসে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানেই কবি যুদ্ধের অযৌক্তিকতা চরমভাবে তুলে ধরেছেন।
সবশেষে কবি বলেন—“বিজ্ঞানের তাপ নয়, আলো তুলে ধরো।” অর্থাৎ বিজ্ঞান যেন ধ্বংসের হাতিয়ার না হয়ে আলোর, মানবকল্যাণের মাধ্যম হয়। এই বক্তব্যে কবি যুদ্ধের বিপরীতে মানবিকতা, শান্তি ও সভ্যতার পক্ষে অবস্থান নেন। ফলে ‘যুদ্ধ কেন?’ কবিতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী মানবিক দলিল হয়ে ওঠে।
২. ‘যুদ্ধ কেন?’ কবিতায় কবির প্রশ্নধর্মী ভঙ্গি ও প্রতিবাদী চেতনার তাৎপর্য আলোচনা করো।
উত্তর:
‘যুদ্ধ কেন?’ কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রশ্নধর্মী ভঙ্গি। দিনেশ দাস এই কবিতায় সরাসরি কোনো উপদেশ দেন না, কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন না। বরং তিনি প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুড়ে দেন মানবসমাজের দিকে। এই প্রশ্নগুলো সাধারণ প্রশ্ন নয়; এগুলো অস্তিত্বমূলক, নৈতিক ও দার্শনিক প্রশ্ন। “কেন হবে বারবার বর্বর এই অভিনয়?”—এই প্রশ্ন কবিতার কেন্দ্রে অবস্থান করছে এবং পাঠককে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
প্রশ্নধর্মী ভঙ্গির মাধ্যমে কবি মানবসভ্যতার ভণ্ডামি উন্মোচন করেছেন। সভ্যতার নামে মানুষ যে বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে, তা কবির কাছে এক ধরনের অভিনয়—একটি নিষ্ঠুর নাটক, যা বারবার মঞ্চস্থ হচ্ছে। যুদ্ধকে তিনি কোনো বীরত্বগাথা হিসেবে দেখাননি; বরং একঘেয়ে, অর্থহীন ও অমানবিক কর্মকাণ্ড হিসেবে তুলে ধরেছেন। এই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি যুদ্ধের পুনরাবৃত্তির প্রতীক।
কবির প্রশ্নগুলো কেবল শাসকগোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে নয়; সাধারণ মানুষের প্রতিও। কারণ যুদ্ধ কেবল কিছু নেতার সিদ্ধান্তে হয় না—মানুষের নীরব সম্মতি, উদাসীনতা ও অন্ধ আনুগত্যও যুদ্ধকে সম্ভব করে তোলে। কবি যেন পাঠককে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করছেন—আমরা কি সত্যিই যুদ্ধ চাই? নাকি বিকল্প পথ থাকা সত্ত্বেও আমরা ধ্বংসকেই বেছে নিচ্ছি?
এই কবিতায় প্রতিবাদ খুব উচ্চকণ্ঠে নয়, বরং যুক্তি ও কল্পনার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। কবি বিকল্পের কথা বলেন—পৃথিবী বড়ো, জায়গার অভাব নেই, নতুন নতুন ভূমি চাষ করা যায়, বিজ্ঞানের সাহায্যে আলো ছড়ানো যায়। এই বিকল্পগুলো তুলে ধরেই কবি যুদ্ধের অপ্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করেন। প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি দেখান—যুদ্ধ অনিবার্য নয়, বরং মানুষের তৈরি এক ভয়ংকর অভ্যাস।
প্রতিবাদী চেতনার আরেকটি দিক হলো যুদ্ধের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান। কবি জেতা-হারা, জাতি-রাষ্ট্রের সীমা অতিক্রম করে মানবজীবনের মূল্যকে সামনে আনেন। তাঁর কাছে যুদ্ধ মানে মৃত্যুর হাওয়া—যা নির্বিচারে সবাইকে স্পর্শ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি কবিতাটিকে আন্তর্জাতিক ও সর্বজনীন করে তোলে।
এইভাবে প্রশ্নধর্মী ভঙ্গি ও প্রতিবাদী চেতনার মাধ্যমে ‘যুদ্ধ কেন?’ কবিতা আধুনিক যুদ্ধবিরোধী সাহিত্যধারার এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
৩. ‘যুদ্ধ কেন?’ কবিতায় বিকল্প সভ্যতা ও মানবকল্যাণের যে স্বপ্ন কবি দেখিয়েছেন, তা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর:
দিনেশ দাসের ‘যুদ্ধ কেন?’ কবিতা কেবল যুদ্ধের সমালোচনাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি বিকল্প সভ্যতার স্বপ্নও উপস্থাপন করে। কবি ধ্বংসের বিপরীতে সৃষ্টির কথা বলেন, অন্ধ আগ্রাসনের বিপরীতে মানবকল্যাণের কথা বলেন। তাঁর মতে, পৃথিবী এত বড়ো যে মানুষের মধ্যে সংঘাতের কোনো বাস্তব কারণ নেই। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি বিকল্প পথের সন্ধান দেন।
কবিতায় কবি বলেন—পৃথিবীকে জলাভূমি, মাঠ, জঙ্গল হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। এই চিত্রকল্প প্রকৃতিনির্ভর, শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সভ্যতার ইঙ্গিত দেয়। যুদ্ধ যেখানে প্রকৃতি ধ্বংস করে, সেখানে কবির স্বপ্ন প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের। মেরু অঞ্চলে বসতি স্থাপন বা কিরঘিজ স্টেপিসে বীজ বোনার কল্পনা মানবজাতির সৃজনশীল অভিযাত্রার প্রতীক। এই অভিযাত্রা ধ্বংসের নয়, বরং নির্মাণের।
কবি বিজ্ঞানের কথাও বলেছেন, কিন্তু তা যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে নয়। “বিজ্ঞানের তাপ নয়, আলো তুলে ধরো”—এই পঙ্ক্তিতে বিজ্ঞানকে মানবমুক্তির হাতিয়ার হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। আধুনিক বিশ্বে বিজ্ঞান যেমন পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছে, তেমনি চিকিৎসা, যোগাযোগ ও শিক্ষার বিস্তারও ঘটিয়েছে। কবি চান মানুষ যেন ধ্বংসাত্মক বিজ্ঞান পরিত্যাগ করে মানবকল্যাণমূলক বিজ্ঞানের পথ বেছে নেয়।
এই বিকল্প সভ্যতার স্বপ্নে কোনো জাতিগত বা রাষ্ট্রীয় বিভাজন নেই। কবির দৃষ্টিতে পৃথিবী এক, মানুষ এক। যুদ্ধের মাধ্যমে সীমান্ত বদলালেও মানুষের দুঃখ একরকমই থাকে। তাই তিনি যুদ্ধের বদলে সহযোগিতা, কল্পনা ও সৃজনশীলতাকে সামনে আনেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক মানবতাবাদী চিন্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
সবশেষে বলা যায়, ‘যুদ্ধ কেন?’ কবিতায় দিনেশ দাস যুদ্ধবিরোধী অবস্থান থেকে এক মানবিক, শান্তিপূর্ণ ও সৃজনশীল সভ্যতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। এই স্বপ্ন আজও সমান প্রাসঙ্গিক, কারণ যুদ্ধ আজও থামেনি, আর মানবতার প্রশ্ন আজও উত্তরহীন।
0 Comments