১. সোভিয়েত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর:
সোভিয়েত রাজনৈতিক ব্যবস্থা সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের উপর ভিত্তি করে গঠিত ছিল এবং একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্য রাখত। এটি ছিল একদলীয় শাসনব্যবস্থা, যেখানে সম্পূর্ণভাবে কমিউনিস্ট পার্টির আধিপত্য ছিল এবং কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দল অনুমোদিত ছিল না। রাষ্ট্র রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করত। অর্থনীতি ছিল কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত, যেখানে উৎপাদন, বণ্টন ও মূল্য নির্ধারণ সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করা হয়েছিল এবং প্রধান শিল্প, ভূমি ও সম্পদ রাষ্ট্রের মালিকানায় ছিল। যদিও এই ব্যবস্থা শ্রমিক শ্রেণির প্রতিনিধিত্বের দাবি করত, বাস্তবে এটি অত্যন্ত بيرোক্রেটিক ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে, যেখানে জনগণের প্রতি জবাবদিহির অভাব ছিল এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ছিল না।
২. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কীভাবে USSR একটি বৈশ্বিক মহাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে?
উত্তর:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সামরিক শক্তি ও পূর্ব ইউরোপের উপর নিয়ন্ত্রণের কারণে USSR একটি বৈশ্বিক মহাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সোভিয়েত সেনাবাহিনী ফ্যাসিবাদী শক্তির হাত থেকে একাধিক পূর্ব ইউরোপীয় দেশকে মুক্ত করেছিল এবং পরে এই দেশগুলি সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুরূপ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এরা মিলিতভাবে সমাজতান্ত্রিক ব্লক বা দ্বিতীয় বিশ্ব গঠন করে, যা ওয়ারশ প্যাক্ট নামক সামরিক জোটের মাধ্যমে আবদ্ধ ছিল এবং যার নেতৃত্বে ছিল USSR। বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ, ভারী শিল্প, এবং শক্তিশালী পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সাহায্যে সোভিয়েত অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। ১৯৪০-এর দশকের শেষদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পরেই USSR বিশ্বের দ্বিতীয় শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হয়।
৩. কেন সোভিয়েত ব্যবস্থা নিজ দেশের জনগণের মধ্যে অপ্রিয় হয়ে ওঠে?
উত্তর:
সোভিয়েত ব্যবস্থা ধীরে ধীরে অপ্রিয় হয়ে ওঠে কারণ এটি ছিল بيرোক্রেটিক, কর্তৃত্ববাদী ও গণতন্ত্রবিহীন। নাগরিকদের বাক্স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মতো মৌলিক অধিকার ছিল না। একদলীয় শাসনের ফলে সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করত না। অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে ভোগ্যপণ্যের ঘাটতি দেখা দেয় এবং জীবনযাত্রার মান কমে যায়। দলীয় অভিজাতদের ভোগ করা বিশেষাধিকার ও দুর্নীতি সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। সমতার প্রতিশ্রুতি থাকলেও রাশিয়ার আধিপত্যের কারণে আঞ্চলিক বৈষম্য বেড়ে যায়। এসব কারণে ব্যাপক অসন্তোষ ও সংস্কারের দাবি জোরদার হয়।
৪. USSR-এর ভাঙনে মিখাইল গর্বাচেভের ভূমিকা আলোচনা করো।
উত্তর:
মিখাইল গর্বাচেভ ১৯৮৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন এবং সোভিয়েত ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে ব্যাপক সংস্কার শুরু করেন। তাঁর নীতির উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক গণতন্ত্রীকরণ, যাতে বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা যায়। তবে এসব সংস্কার কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে দেয় এবং ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলি প্রকাশ্যে আসে। দলের কট্টরপন্থীরা এসব নীতির বিরোধিতা করে, ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। ১৯৯১ সালের ব্যর্থ কুপ পরিস্থিতিকে আরও দুর্বল করে তোলে। শেষ পর্যন্ত গর্বাচেভের সংস্কার অনিচ্ছাকৃতভাবে USSR-এর পতন ত্বরান্বিত করে।
৫. ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের দিকে নিয়ে যাওয়া ঘটনাগুলি বর্ণনা করো।
উত্তর:
১৯৯১ সালে কমিউনিস্ট পার্টির কট্টরপন্থীরা সংস্কার প্রত্যাহার ও পুরনো শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে একটি কুপের চেষ্টা করে। কিন্তু জনগণ রাজনৈতিক স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে। বরিস ইয়েলৎসিন কুপের বিরোধিতা করে গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়া, ইউক্রেন ও বেলারুশ ঘোষণা করে যে USSR আর অস্তিত্বে নেই। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয় এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায়। উত্তরাধিকারী রাষ্ট্রগুলো পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্র গ্রহণ করে, ফলে সোভিয়েত যুগের অবসান ঘটে।
৬. সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের প্রধান কারণগুলি কী ছিল?
উত্তর:
USSR-এর ভাঙনের পেছনে একাধিক অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা দায়ী ছিল। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয় এবং অর্থনীতি স্থবিরতায় ভোগে। অতিরিক্ত সামরিক ব্যয় সম্পদ নিঃশেষ করে দেয়। প্রশাসনিক দুর্নীতি ও জবাবদিহির অভাব শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে। ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ও দলীয় কর্মকর্তাদের বিশেষাধিকার জনগণকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে। এসব সম্মিলিত কারণ ব্যবস্থার পতনের পথ প্রশস্ত করে।
৭. পোস্ট-কমিউনিস্ট দেশগুলিতে ‘শক থেরাপি’ ধারণাটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর:
শক থেরাপি বলতে পোস্ট-কমিউনিস্ট দেশগুলিতে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি থেকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় দ্রুত রূপান্তরকে বোঝায়। IMF ও বিশ্বব্যাংকের প্রভাবে এই নীতিতে শিল্পের বেসরকারিকরণ, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার এবং বাজার উদারীকরণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। লক্ষ্য ছিল দ্রুত বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত হওয়া। তবে হঠাৎ এই পরিবর্তনের ফলে গুরুতর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দেয়।
৮. শক থেরাপির পরিণতিগুলি কী ছিল?
উত্তর:
শক থেরাপির ফলে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিল্পের পতন ঘটে এবং ব্যাপক বেসরকারিকরণ হয়। সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় বেকারত্ব ও দারিদ্র্য দ্রুত বৃদ্ধি পায়। অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়ে যায় এবং অল্প কিছু মানুষ উপকৃত হয়। দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলির সুযোগ নিয়ে দুর্নীতি ও মাফিয়া কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়। যদিও পরে কিছু অর্থনীতি স্থিতিশীল হয়, তাৎক্ষণিক প্রভাব ছিল সামাজিকভাবে যন্ত্রণাদায়ক ও অর্থনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল।
৯. USSR-এর পতন কীভাবে ঠান্ডা যুদ্ধের অবসান ঘটায়?
উত্তর:
USSR-এর পতনের ফলে সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মধ্যকার আদর্শিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে। একটি মহাশক্তি বিলুপ্ত হওয়ায় দ্বিধ্রুব বিশ্বব্যবস্থার পতন ঘটে। অস্ত্র প্রতিযোগিতা ধীর হয় এবং আদর্শিক সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র মহাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, ফলে ঠান্ডা যুদ্ধের যুগের সমাপ্তি ঘটে।
১০. দ্বিধ্রুবতার অবসানের পর বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের উদ্ভব ব্যাখ্যা করো।
উত্তর:
ঠান্ডা যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র প্রাধান্যশীল শক্তি হলেও ধীরে ধীরে অন্যান্য ক্ষমতাকেন্দ্রের উত্থান ঘটে। সোভিয়েত ব্লকের পতনের ফলে নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র ও আঞ্চলিক শক্তির আবির্ভাব হয়। বিশ্ব রাজনীতি দুইটি বিপরীত ব্লকের পরিবর্তে বহু রাষ্ট্র ও গোষ্ঠীর প্রভাবাধীন বহুমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয়।
১১. USSR ভেঙে যাওয়ার পর বিশ্ব রাজনীতিতে কী পরিবর্তন ঘটে?
উত্তর:
বিশ্ব রাজনীতিতে আদর্শিক সংঘাত ও অস্ত্র প্রতিযোগিতার অবসান ঘটে। পুঁজিবাদ ও উদার গণতন্ত্র প্রাধান্য লাভ করে। IMF ও বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রভাব বৃদ্ধি পায়। নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রগুলির আবির্ভাব ঘটে, যাদের প্রত্যেকের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছিল। বিশ্ব সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতার পথে অগ্রসর হয়।
১২. কমনওয়েলথ অব ইন্ডিপেনডেন্ট স্টেটস (CIS)-এর গঠন ও গুরুত্ব আলোচনা করো।
উত্তর:
USSR ভেঙে যাওয়ার পর সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক পরিচালনার জন্য CIS গঠিত হয়। শুরুতে কিছু প্রজাতন্ত্র বাদ পড়লেও পরে তারা প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়। CIS অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়। রাশিয়া উত্তরাধিকারী রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে USSR-এর আসন লাভ করে।
১৩. পোস্ট-কমিউনিস্ট দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আলোচনা করো।
উত্তর:
ভারত সব পোস্ট-কমিউনিস্ট দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ঠান্ডা যুদ্ধের পর পরিবর্তনের সঙ্গে ভারত সহজেই খাপ খাইয়ে নেয়। বাণিজ্য, কূটনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় সহযোগিতার ওপর জোর দেয়। এসব দেশের মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিক বন্ধন ও কৌশলগত স্বার্থের কারণে সবচেয়ে দৃঢ় থাকে।
১৪. বিশ্বব্যবস্থা সম্পর্কে ভারত ও রাশিয়ার অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর:
ভারত ও রাশিয়া শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সমষ্টিগত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তিতে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে সমর্থন করে। তারা সংঘাতের সমাধানে আলোচনার ওপর জোর দেয় এবং জাতিসংঘকে শক্তিশালী করার পক্ষে। উভয় দেশই একক মহাশক্তির আধিপত্যের বিরোধিতা করে এবং ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক শাসনের পক্ষে মত দেয়।
১৫. ঠান্ডা যুদ্ধের পরেও কেন ভারত–রাশিয়া সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ রয়ে গেছে?
উত্তর:
ভারত–রাশিয়া সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা ও অভিন্ন স্বার্থের কারণে আজও গুরুত্বপূর্ণ। কাশ্মীর ও সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে রাশিয়া ভারতের পক্ষে সমর্থন জানায়। প্রতিরক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও মধ্য এশিয়ায় প্রবেশাধিকার বিষয়ে ভারত রাশিয়ার সহযোগিতা লাভ করে। ভারত রুশ অস্ত্রের একটি বড় বাজার। এসব কারণে তাদের কৌশলগত অংশীদারিত্ব অব্যাহত রয়েছে।
To get chapter wise all suggestion click here
0 Comments